একটা সময় ছিল, যখন বিশ্ব ক্রিকেটের ফ্র্যাঞ্চাইজি বাজারে বা কাউন্টির ঐতিহ্যবাহী আঙিনায় ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগের বিজ্ঞাপনী মুখ ছিলেন শুধুই সাকিব আল হাসান। বাকিদের জন্য গ্লোবাল ক্রিকেটের দরজাগুলো ছিল অদৃশ্য এক কাঁটাতারে ঘেরা। ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশি ক্রিকেটের সেই চেনা মানচিত্রটা বদলে গেছে। যোগ হয়েছে পেসার মুস্তাফিজের নাম। ক্যারিবিয়ান সাগরতীরে সিপিএলের মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন মেহেদী হাসান মিরাজ বল হাতে ১৩ রানে ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাজিক দেখান কিংবা ইংল্যান্ডের স্যাঁতসেঁতে কাউন্টি ক্রিকেটে কেন্টের ‘পোস্টারবয়’ হয়ে হাসান মাহমুদ গতির ঝড় তোলেন– তখন বুঝতেই হয়, বিশ্ব ক্রিকেটের দরবারে বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের কদর এখন আকাশছোঁয়া।
লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে তাওহীদ হৃদয়ের ব্যাটের সেই নির্ভীক আস্ফালন স্রেফ কাকতালীয় কোনো ঘটনা নয়। এটি আসলে প্রমাণ করে, ক্রিকেট দুনিয়ার করপোরেট ও কৌশলগত টেবিলে লাল-সবুজের ক্রিকেটীয় ব্র্যান্ড ভ্যালু এখন কতটা লোভনীয়। সাকিবের সেই একাকী সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে একঝাঁক তরুণ সওদাগর এখন বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের নতুন পতাকা ওড়াচ্ছেন।
যার মধ্যে পাকিস্তানের ফ্র্যাঞ্চাইজিতে নাহিদ রানা, ইংল্যান্ডের কাউন্টিতে হাসান মাহমুদ, লঙ্কান ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে তাওহীদ হৃদয়, বিগব্যাশে রিশাদ হোসেন এরই মধ্যে সেখানকার দর্শকের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন। বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের এই জয়যাত্রায় এবার নতুন পালক যুক্ত হতে চলেছে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন আর অ্যাডিলেডের বুকে। ক্রিকেটপাড়ায় জোর গুঞ্জন, অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহ্যবাহী ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ ‘বিগ ব্যাশ’-এর দলগুলো এখন বুঁদ হয়ে আছে বাংলাদেশের গতিদানব নাহিদ রানার আগুনে গতিতে। ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল ছুড়ে ব্যাটারদের বুকে কাঁপন ধরানো এই তরুণ তুর্কিকে দলে ভেড়াতে এরই মধ্যে অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্সসহ আলোচনা শুরু করেছে বিগ ব্যাশের একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজি।
যদিও ঠাসা আন্তর্জাতিক সূচি আর ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের কারণে বিসিবি শেষ পর্যন্ত অনাপত্তিপত্র দেবে কিনা, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। কেননা ডিসেম্বরের ওই সময়টাতে বাংলাদেশ দল দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাবে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দুটি ম্যাচ খেলতে। সেখানে নাহিদ রানাকে চাইছে টিম ম্যানেজমেন্ট। তবে ওই সফরে তিনি যদি শুধু দুটি টেস্ট খেলে চলে আসেন, তাহলে হয়তো বিগ ব্যাশের কিছু ম্যাচ খেলতে পারবেন। বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে কুলীন আসরগুলোতেও এখন বাংলাদেশের পেস বোলিং সমীহ-জাগানিয়া ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।
উপমহাদেশের বাইরে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়াতেও এখন নজর কাড়ছেন তারা। ইংল্যান্ডের কাউন্টি দল কেন্টের হয়ে একসঙ্গে একই ম্যাচে মাঠে নেমে ইতিহাস গড়েছেন হাসান মাহমুদ ও সৈয়দ খালেদ আহমেদ। ডার্বিশায়ারের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথম ইনিংসে লাল বল হাতে দুই টাইগারের সম্মিলিত গতি আর সুইংয়ের তোপে রীতিমতো কেঁপে ওঠে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপ। কাউন্টিতে নিজের অভিষেক ম্যাচ খেলতে নেমে অসাধারণ বোলিংয়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট পকেটে পুরেন খালেদ আহমেদ। কাউন্টির মঞ্চে বিদেশি কোটার দুজন খেলোয়াড়ই বাংলাদেশের এবং তাদের এই বিধ্বংসী দাপট আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশি পেস আক্রমণের নবজাগরণের প্রমাণ দেয়। কেন্টের হয়ে হাসান মাহমুদ যে চারটি ম্যাচ খেলেছে তার সবগুলোতে জয় এসেছে। এর বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে পিএসএলে চাঁপাই এক্সপ্রেস নাহিদ রানা মাত্র ৫ ম্যাচে ৯ উইকেট শিকার করে টুর্নামেন্টে দারুণ আলো ছড়ান।
অন্যদিকে, লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের যাতায়াত বেড়েছে, যেখানে তাওহীদ হৃদয় দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে গত মৌসুমগুলোতে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর অন্যতম বিশ্বস্ত ভরসা হয়ে ওঠেন। এ ছাড়া তাসকিন-শরিফুলরা লঙ্কান পিচে বল হাতে প্রতিপক্ষের ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছেন। সবশেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে গায়ানা আমাজন ওয়ারিয়র্সের হয়ে সম্প্রতি অভিষেক হওয়া অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ তাঁর প্রথম ম্যাচে ৩ উইকেট নিয়ে রীতিমতো বাজিমাত করেছেন, যা বিদেশি লিগগুলোতে লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের ক্রমবর্ধমান কার্যকারিতা ও আকাশছোঁয়া চাহিদাকে ফুটিয়ে তোলে।
খুলনা গেজেট/এনএম

